ঢাকা
১৩ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
৩০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আহলে বায়তে রাসূলের পরিচয় ও তাঁদের মর্যাদা

মুহররম মাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় হিজরী সনের যাত্রা। মানব ইতিহাসে অনক ঘটনার সাক্ষ্যবহন করছে এ মাস। আর মুহররমের দশ তারিখ বহু ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যময় ঘটনার কারণে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়িত ৬১ হিজরীতে কারবালা প্রান্তরের মর্মষ্পর্শী ঘটনা। আজ হতে প্রায় ১৩৭২ বছর পূর্বে ন্যায় ও সত্যকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আহলে বায়তের অন্যতম সিপাহসালার সৈয়্যদুনা হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুসহ ৭২জন বা ৮২জন মরদে মুজাহিদ কারবালা প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন। সত্য ও মিথ্যার বিরোধ চলে আসছে পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে। এমন এক অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন সুলতানে জান্নাত ইমাম আলী মকাম হযরত হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুসহ আহলে বাইতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সদস্যবর্গ। তার পক্ষে লড়ছিলেন স্বল্পসংখ্যক ঈমানের বলে বলীয়ান তেজোদ্বীপ্ত মুমিন মুসলমান, পক্ষান্তরে পাপিষ্ট কুখ্যাত এযিদের হাতে হাত দিয়ে জোট বেধে সুবিধাবাদী, পদলোভী ও অসৎ চরিত্রের একটা বড় অংশ। সে সময়ে কারবালার ঘটনা দৃশ্যত এযিদের অনুকূলে গেলেও তা ছিল নিতান্তই সাময়িক। চূড়ান্ত পর্যায়ে বেরিয়ে আসে সত্যের এক মাহান বিজয়। আর কোরান-সুন্নাহ ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-“সেই বিজয়ে বেহেশ্তী মুকুট পরেন ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, হযরত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আহলে বাইতগণ ছিলেন খুবই প্রিয় ও তাঁর পরমাত্মীয়। আহলে বাইত এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও মর্যাদা প্রবন্ধে উপস্থাপন করা হল।

আহলে বাইত কারা:
দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, আমরা মুসলমান হয়ে ও আহলে বাইত তথা আউলাদে রাসূলকে চিনিনা বা চেনার চেষ্টা ও করি না। আবার কোন সময় চিনলেও সাধারণভাবে তাঁদের সম্মান প্রদর্শন করি। এটা কি আমাদের জন্য লজ্জার বিষয় নয়? অবশ্যই আহলে বাইত আল্লাহ তাবারাকওয়া তাআলা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় পাত্র। েেসদিেেক নির্দেশ করেই আল্লাহ রাব্বুল আলামী ন তার ভাষায় পবিত্র কোরআনুল করীমে এরশাদ ফরমান-
قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى
অর্থাৎ: হে হাবীব, আপনি বলে দিন যে, আমি (রাসূল) তোমাদের নিকট কোন বিনিময় চাইনা তবে (আমার) কিটাত্মীয়দের ভালবাসা ব্যতীত । [সূরা শুরা-২৩]

এ আয়াতে করীমা নাযিল হওয়ার পর সম্মানিত সাহাবায়ে কেরামগণ রাসূলে আকরম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র নিকট তাদের সম্পর্কে বিনয়ের সাথে জানতে চাইলেন-
يا رسول الله صلى الله عليه وسلم من قرابتك الذين وجب عليهم المودة
অর্থাৎ: হে আল্লাহর রসূল! আপনার নিকটাত্মীয় কারা? যাদের প্রতি (আমাদের ) আন্তরিক ভালবাসা প্রদর্শন করা ওয়াজিব! সরকারে কায়েনাত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন-
على وفاطمة والحسن والحسين وأبنائهما
অর্থাৎ: তারা (আহলে বাইয়াত হলেন হযরত আলী, হযরত ফাতিমা, হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা এবং তাদের উভয়ের আউলাদ।
বস্তুতঃ উপরিউক্ত আহলে বাইত ছিলেন রাসূল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খুবই নিকটতম আপনজন। পবিত্র কুরআনে তাদের পবিত্রতা ঘোষণা করে আল্লাহ পাকের ইরশাদ হয়-
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا
অর্থাৎ- হে আহলে বাইত! নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। [সূরা আহযাব-৩৩]
আয়াতটি নাযিল হলে হযরত আবু সাঈদ খুদরী, হযরত আয়েশা সিদ্দিকা ও উম্মে সালমা (রাদ্বিয়াল্লাহ আনহুম) বলেন এটি “আহলে বাইত” মা ফাতেমা, হযরত আলী, ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।

আহলে বাইত এর পরিচয়ে প্রখ্যাত সাহবী হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং তাবেঈ হযরত মুজাহিদ, হযরত ক্বাতাদাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) সহ অন্যান্য মুফাসসিরের মতে আহলে বায়ত বলতে “আহলে কাসা” অর্থাৎ চাঁদরাবৃত কে বুঝানো হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো-কারা এই চাঁদরাবৃত? এই প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে এসেছে-
عن عائشة قالت خرج النبي صلى الله عليه وسلم غداة وعليه مرط مرحل من شعراسود فجاء الحسن بن علي فادخله ثم جاء الحسين فدخل معه ثم جاءت فاطمة فادخلها ثم جاء على فادخله ثم قال إنما يريد الله ليذهب عنكم الرجس أهل البيت ويطهركم تطهيرا
অর্থাৎ, হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- একদা নবী পাক সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যুষে বের হলেন, তখন তাঁর শরীর মুবারক কালো নকশা বিশিষ্ট চাদার দ্বারা আবৃত ছিল। অতঃপর ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আসলে নবীজী তাকে চাঁদরের মধ্যে শামিল করে নিলেন। এরপর ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আসলেন তাঁকেও নবীজী চাঁদর মুবারকে অর্ন্তভুক্ত করে নিলেন। অতঃপর আসলেন হযরত মা ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রসূল তাঁকেও চাঁদরের অভ্যন্তরে নিয়ে নিলেন। সর্বশেষ আসলেন শেরে খোদা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু নবীজি তাঁকেও তাঁর নুরানী চাঁদর মুবারকে প্রবেশ করিয়ে নিলেন। অতঃপর তিলাওয়াত করলেন- হে আহলে বাইত নিশ্চয় আল্লাহ পাক চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে”। অতঃপর রব্বুল আলামীনের দরবারে এই দোয়া করলেন-
اللهم هولاء أهل بيتي وخاصتي فاذهب عنهم الرجس
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! এরাই আমার আহলে বাইত এবং ঘনিষ্টজন। আপনি এদের থেকে অপবিত্রতা দূরীভূত করুন আর এদেরকে পরিপূর্ণভাবে পবিত্র করুন।
অপর এক হাদীসে এসেছে হযরত উসামা ইবনে যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘আমি নবীজীর খিদমতে উপস্থিত হয়ে দেখলাম নবীজী এমনভাবে কম্বল জড়িয়ে বসে আছেন মনে হলো তার ভিতরে তিনি কিছু লুকিয়ে রেখেছেন। আমি আবেদন করলাম, হুজুর কম্বলের ভিতরে কী যেন লুকিয়ে আছে মনে হচ্ছে? সাথে সাথে নবীজী কম্বল খানা খুলে দিলেন তখন দেখা গেল নবীজীর নুরানী কোলে বসে আছেন ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা। অতঃপর নবীজী ইরশাদ করলেন-
اللهم إني احبهما فاحبهما واحب من يحبهما
অর্থাৎ-হে আল্লাহ! আমি এই দু’জনকে ভালবাসি সুতরাং তুমিও এদেরকে ভালবাস। এবং ভালবাস তাদেরকে যারা এদেরকে ভালবাসে।

অতএব প্রতীয়মান হলো যে, আহলে বাইত হলো শেরে খোদা আলী, হযরত মা ফাতিমা, হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা ও তাঁদের সন্তানগণ। উল্লেখ্য, আরবী ভাষায় ঘরকে বাইত বলা হয়। ঘর তিন প্রকার। যথা- ১. বংশীয় ঘর (সম্পর্ক) ২. অবস্থানগত ঘর (সম্পর্ক) ৩. জন্মগত ঘর (সম্পর্ক)।
বংশগত ঘর বলতে মানুষের সে সম্পর্ককে বুঝায় যা বংশীয় আতœীয়তার সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ, বাপ দাদার কারণে সম্পর্ক। যথা, চাচা, ফুফু ইত্্যাদী।
অবস্থানগত সম্পর্ক বলতে সে সম্পর্ককে বুঝায় যা ঘরের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। যথা- স্ত্রীকুল রমণীগণ। জন্মগত সম্পর্ক বলতে সেই বংশধরকে বুঝায় যারা ঘরে ভূমিষ্ট হয়। যথা- পুত্র, কন্যা, নাতি নাতনী ইত্যাদি।
যখন সাধারণভাবে আহলে বাইত বলা হয় তখন উপরে বর্ণিত তিন প্রকারের সম্পর্ককে বুঝায়। শর্ত হল, তাদের ঈমানদার হতে হবে। এ তিন প্রকারের মধ্যে কোন একটিকে পরিহার করলে আহলে বাইতের অর্থ পরিপূর্ণ হয় না। যারা কুরআন মাজীদে উলিøিখত আহলে বাইত দ্বারা কেবল নবীজির স্ত্রীকে বুঝান তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা জন্মগত বংশধরদের ঘর থেকে বের করতে চেষ্টা করেন।তাদের এ বক্তব্য উপরিউক্ত বর্ণনাসমূহের সাথে সাংঘর্ষিক।

আহলে বাইয়াতের মর্যাদা:
যিবহ ইসমাঈল যে যবহি আযীম দ্বারা পরিবর্তন হয়ছিল, তা হুযুর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আভির্ভাবের পর পূর্ণতা লাভ করে। এ প্রসঙ্গে ড. আল্লামা ইকবাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-
সিররে ইব্রাহিমে ও ইসমাঈলে বুয়দ
ইয়ানি আঁ ইজমালরা তাফসীরে বুয়দ
অর্থাৎ: ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এর সেই কোরবানীর ঘটনা ছিল অস্পষ্ট এবং থিওরি, আর তার প্রেকটিকেল রূপ হল কারবালার জমিনে ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত । সুবাহানাল্লাহ!

হযরত ইবরাহিম (আ.) তার বংশ কিয়ামত পর্যন্ত ইমামত ও বেলায়তের ধারা অব্যাহত থাকার জন্য যে দোয়া করেছিলেন। তা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পর শেরে খোদা হযরত আলী ও নবী দুলারী মা ফাতিমা (রা.) এর বংশে প্রবর্তিত হয়। কারবালার ময়দানে নবী-করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত উজ্জ্বল সুরুজ প্রমাণ করল তিনিই বেহেশতের সর্দার হওয়ার পূর্ণ হকদার। ইমাম হোসাইন (র.)এর আর শাহাদাতে সেই মহামহিন কালজয়ী পাঁগড়ী, যা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর আপন হাত মুবারকে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাথায় পরিয়ে দিয়েছেন। কেননা তার এই শাহাদাত স্বয়ং নবী মোস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এর শাহাদাতের রূপান্তিরত রূপ।

আহলে বাইয়াত তথা আউলাদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাকে আল্লাহ তায়ালা যে মর্যদা দান করেছেন তা সাধারণ মুমিন মুসলমানদের দান করেননি। কারণ তারা আল্লাহর রাসূলের বংশধর। ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা কে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা নিজের পুত্রের মত ভালবাসতেন। হাদীসে পাকে এসেছে
عن عبد الله مسعود رضى الله عنه رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم اخذ بيد الحسن و الحسين ويقول هذان ابنائ
অর্থাৎ: হযরত আবদুল্লাহ বিন মসউদ (র.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি দেখেছি, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনের হাত ধরে বলেছেন-এরা আমার সান্তান।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাদৃশ ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন
হাদীসে পাকে এসেছে হযরত আনাস বিন মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত

انس رضى الله عنه قال: كان الحسن والحسين أشبه برسول الله صلى الله عليه سلم عن
অর্থাৎ- হযরত আনাস (র.) বলেন ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন আলাইহিমাস সালাম উভয়ই হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সবচেয়ে বেশী সাদৃশ্যমান ছিলেন।
তাবরানী শরীফের অপর এক হাদীসে রয়েছে-
عن علي رضى الله عنه قال الحسن اشبه برسول الله صلى الله عليه وسلم ما بين الصدر إلى الرأس والحسين اشبه بالنبي صلى الله عليه وسلم ما كان اسفل من ذلك
অর্থাৎ- হযরত মাওলা আলী শেরে খোদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- ইমাম হাসান বক্ষ থেকে পা পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পুরোপুরি সাদৃশ্যমান।

আহলে বাইত সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানী বংশের অধিকারী
আহলে বাইতের বংশধরগণ দুনিয়ার সমস্ত মানুষের চেয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী, এ প্রসঙ্গে হাদীসে পাকে এসেছে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- আল্লাহ তাআলা হযরত ইসমাঈল আলাইহিসসালাম এর আউলাদের মধ্যে কুররা গোত্রকে নির্বাচন করেছেন। তার মধ্য থেকে কোরাইশ বংশকে, আর কোরাইশ বংশ হতে বনী হাশেমকে এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বনী হাশেম হতে আমাকে নির্বাচন করেছেন।

উ¤মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- একদা জিবরাঈল আমীন এসে আমাকে বললেন-আমি জমিনের পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত সবখানে তালাশ করলাম। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে উত্তম মর্যদাবান কাউকে পাইনি। ইমামে আহলে সুন্নাত আ’লা হযরত শাহ আহমদ রেযা ফাযেলে বেললভী আলাইহি রহমমাত বলেছেন-
সিদরাওয়ালা তথা হযরত জিব্রাঈল আলাহিস সালাম বললেন-পৃথিবী বাগানসমূহ সবই আমি প্রত্যক্ষ করেছি কিন্তু আমি কাউকে (ইয়া রাসূলাল্লাহ) আপনার মত পাইনি। বস্তুতঃ আপনাকে একক সর্বশক্তিমান আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে সৃজন করেছেন অর্থাৎ আপনার মত আর কাউকে দেখিনি । (হাদায়েকে বখশিশ্)
হাদীসে পাকে এসেছে-
كل سبب ونسب ينقطع يوم القيامة إلا سببي ونسبي
অর্থাৎ, সরকারে দোজাহান সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- কিয়ামত দিবসে তোমাদের সকল সম্পর্ক ও বংশগত বিষয় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, তবে আমার সম্পর্ক ও আমার বংশধর ছাড়া।
ইমাম তাবরানী শরীফে ও দারুস কুতনীর মধ্যে উল্লেখ রয়েছে- রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- “কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের মধ্যে সর্ব প্রথম আহলে বায়ত এর জন্য আমার শাফায়াত হবে। অতঃপর অন্যান্যদের জন্য । আল্লাহর নবী ইরশাদ করেন
من اشفع له أولا فهو أفضل
অর্থাৎ- “আমি যাদের জন্য সর্বপ্রথম সুপারিশ করব, তারাই সর্বাধিক মর্যাদাবান হবে।
এসব হাদীসে পাক থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আহলে বাইতই ফজিলত ও মর্যদায় শ্রেষ্ঠত্বের মহান উঁচুস্থানে আসীন।

আহলে বাইতের প্রতি মুহব্বাত:
আহলে বাইতের প্রতি মুহাব্বতের বহু রেওয়ায়েত আছে, তম্মধ্যে তিরমিযী শরীফে উল্লেখ রয়েছে হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি বিদায় হজ্জের আরাফাত দিবসে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ‘কাসওয়া’ নামক উটের উপর আরোহনরত অবস্থায় বলতে শুনেছি ও দেখেছি- নবীজী ইরশাদ করলেন-
يا ايها الناس إني تركت فيكم ما إن أخذتم به لن تضلوا كتاب الله وعترتي اهل بيتي
অর্থাৎ- হে মানব সম্প্রদায়! আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা তা মজবুতভাবে আকড়ে ধর তবে, তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো কিতাবুল্লাহ ও আমার বংশধর আমার আহলে বাইত।
তাবরানী শরীফে এসেছে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
لايؤمن عبد حتى أكون احب اليه من نفسه وتكون عترتي أحب إليه من عترته وأهلي أحب إليه من أهله وذاتي أحب إليه من ذاته
অর্থাৎ, কোন বান্দা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আমাকে নিজের জীবন থেকে, আমার বংশধরকে তার বংশধর থেকে, আমার পরিবার পরিজনকে তার পরিবার পরিজন থেকে এবং আমার সত্তাকে তার সত্তার চাইতে বেশি ভালবাসবে না।

আউলাদে রাসূলকে যে যত বেশি ভালবাসবে ও সম্মান করবে সে তত বেশী সম্মানের, মর্যাদার অধিকারী হবে। যেখানে একজন ব্যক্তি সারা জীবনের ইবাদতের দ্বারা বলতে পারবে না যে সে জান্নাতী না জাহান্নামী । অথচ সেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নবুয়তের ভাষায় এরশাদ করেন-
فإنه من لقى الله عز وجل فهو يودنا دخل الجنة بشفاعتنا والذي نفسي بيده لاينفع أحد عمله إلا بمعرفة
অর্থাৎ-আমার আহলে বাইত তথা বংশধরগণের সাথে ভালবাসা ও হৃদ্যতা পোষণ করার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন। সুতরাং যারা আমার ও আমার আহলে বাইত তথা আমার বংশধরগণের সাথে ভালবাসা পোষণ করে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ বা মৃত্যু বরণ করবে তারা আমার সুপারিশের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অতঃপর শপথ সে সত্ত্বার যার হাতে আমার প্রাণ তোমাদের কোন আমল উপকারে আসবে না একমাত্র মারেফত তথা, আমার সাথে ও আমার সাথে আন্তরিক সম্পর্কই উপকারে আসবে।

আর যে আহলে বাইতকে ভালবাসে, আল্লাহ ও রাসূল তাকে ভালবাসেন। অসংখ্য হাদীসের কিতাবে এসেছে – যেমন-
عن أبي هريرة رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من احب الحسن والحسين فقد أحبني
অর্থাৎ- হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-যে ব্যক্তি হাসান-হোসাইন আলাইহিমাস সালামকে ভালবেসেছে, সে যেন বাস্তবে আমি রাসূলকে ভালোবেসেছে।
আর যাকে আল্লাহর রাসূল ভালোবেসেছেন আল্লাহও তাকে ভালোবাসবেন। সুতরাং আল্লাহ যাকে ভালোবাসবেন নিঃসন্দেহে তিনি তাকে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। হাদীসে পাকে এসেছে-
عن سلمان رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم للحسن والحسين من أحبهما أحببته ومن أحببته أحبه الله ومن أحبه الله ادخله جنة النعيم
অর্থাৎ, হযরত সালমান ফারসী রাদ্বিয়াল্লাহু বর্ণনা করেন- হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম হাসান ও হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা সম্পর্কে বলেছেন-যে ব্যক্তি তাদেরকে ভালবাসবে তাকে আমি ভালোবাসবো, আর যাকে আমি (নবী) ভালোবাসবো তাকে আল্লাহ পাক ভালোবাসবেন, আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকে ভালোবাসেন তাকে তিনি জান্নাতে নঈমে প্রবেশ করাবেন।

এমনকি দুনিয়ার শেষ পরীক্ষা অর্থাৎ মৃত্যুর পরীক্ষায় ও আওলাদে রাসূলের নেগাহে করমে ও দোয়ার বরকতে সফলতা লাভ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার একাধিক হাদীস দ্বারা সুস্পষ্ট মহানবীর ইরশাদ হয়েছে-
قال عليه السلام ألا ومن مات على حب آل محمد مات مغفورا له وألا من ما على حب آل محمد مات تائبا وأيضا قال ومن مات على حب آل محمد مات مؤمنا
অর্থাৎ, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-“সাবধান! যে ব্যক্তি নবী বংশের ভালোবাসায় ইন্তেকাল করলো, যেন সে ক্ষমা প্রাপ্ত অবস্থায় ইন্তেকাল করল এবং আর যে ব্যক্তি নবী বংশের ভালোবাসা নিয়ে ইন্তেকাল করলো সে যেন তাওবাকারী রূপে ইন্তেকাল করল এবং যে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধরদের ভালোবাসার উপর ইন্তেকাল করলো, সে যেন মুমিন হিসেবে ইন্তেকাল করলো।

আহলে বাইতের মর্যদা ও সম্মানের ব্যাপারে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন
لقرابة رسول الله صلى الله عليه وسلم أحب إلى أن اصل من قرابتي
অর্থাৎ: (যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর সত্ত্বার কসম!) আমার নিকট আমার বংশধর ও আত্মীয়গণের অপেক্ষায় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশধর ও আত্মীয়ের প্রতি সুসম্পর্ক গড়ে তোলা অধিক প্রিয়।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
حب آل محمد صلى الله عليه وسلم خير من عبادة سنة
অর্থাৎ: আলে রসূলকে মহব্বত করা একশ বছরের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।

ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহিআলাইহি বলেন-আমি আহলে বাইতে রসূলেকে এত বেশি ভালোবাসতাম যে, লোকেরা আমাকে রাফেযী বলা শুরু করল। আমি তাদের জবাবে বললাম-
لوكان رفضا حب آل محمد فليشهد الثقلان اني رافضي
অর্থাৎ, আলে রসূলের ভালোবাসার নাম যদি রাফেজী হয় তাহলে হে জ্বিন জাতি ও মানব জাতি উভয় সম্প্রদায় যেন স্বাক্ষী হয়ে যায় এই অর্থে যে আমি রাফেযী। এরপর আহলে বায়তের মহব্বতে তিনি আরও বলেন-
يا اهل بيت رسول الله ان حبكم فرض من الله في القرآن انزله
অর্থাৎ, হে নবীজীর বংশধরগণ! আপনাদের মহব্বত আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ। আর এই হুকুম মহান আল্লাহর পবিত্র কোরআনে নাযিল করেছেন।
তদ্রƒপ তাদের সাথে যারা শত্রুতা পোষণ করবে তার মূলত আল্লাহ ও রাসূলের সাথে শত্রুতা পোষণ করল, যেমন হাদিসে বর্ণিত আছে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এরশাদ করেন-
اشتد غضب الله على من أذاني في عترتي
অর্থাৎ, আল্লাহর ক্রোধ অতীব কঠোর কঠিন হবে তাদের উপর যারা আমার বংশধরকে কষ্ট দিয়েছে।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আরো বলেছেন “যে আমার বংশ ধরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করল, সে আমার সাথেই বিদ্বেষ পোষণ করল। নবীজী আরো বলেন-
حسين مني وأنا من حسين أحب الله من أحب حسينا
অর্থাৎ: হুসাইন আমার থেকে আমি হুসাইন থেকে, যে হোসাইনকে ভালবাসে তাকে মাহান আল্লাহ ভালোবাসেন।
স্বয়ং নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা আহলে বাইতকে কিভাবে ভালবাসতেন তার একটি দৃষ্টান্ত দেখলেই সহজে বিষয়টি বুঝা যাবে। একদা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা নামাযরত ছিলেন ইমাম হুসাইন ঘর হতে বের হয়ে মসজিদে নববীতে গেলেন এবং দেখতে পেলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা সাহাবীদের নিয়ে নামায পড়ছেন। শিশু ইমাম হুসাইন কালবিলম্ব না করে আল্লাহর রসূলের কাঁধ মুবারকে উঠে গেলেন। এদিকে সিজদা লম্বা হতে থাকে এক পর্যায়ে ইমাম হুসাইন অবতরণ করলে সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামাও মাথা মুবারক সিজাদা হতে উত্তোলন করলেন। নামায শেষে সাহাবীরা সিজাদা দীর্ঘ করার কারণ জানতে চাইলেন রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এরশদ করলেন আমার হোসাইন আমার কাঁধে উঠে গিয়েছিল। আর সে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাওয়ার আশক্সকায় আমি সিজদা দীর্ঘ করি।
ইমাম হুসাইনের এতটুকু কষ্ট ও নবীজী সহ্য করতে পারলে না, তাও আবার নামায অবস্থায় । তাহলে ৬১ হিজরী সনে কারবালার প্রান্তরে কুখ্যাত ইয়াযীদের নর পশুরা ইমামের নূরানী দেহ মুবারকে কত ধরণের নির্যাতন চালিয়ে পরিশেষে দেহ মুবারক থেকে মস্তক শরীফ বিচ্ছিন্ন করল এবং এতে উল্লাস করল (নাউযুবিল্লাহ)। কোন বিবেকবান মানুষে পক্ষে এ নির্যাতনের বিবরণ দেয়া সম্ভব নয়। এমন নির্যাতনে নবীজী কত কষ্ট পেয়েছিলেন তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমানে মুহররম ও আশুরা অনেকটাই কৃত্রিম। লৌকিকতায় পরিপূর্ণ। আজ আশুরার নামে যে মাতম করা হয়, ভালবাসা দেখাতে গিয়ে ছুরি ও ব্লেড দিয়ে শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে রক্তাক্ত করা হয় তা মোটেও ইসলাম ও শরিয়ত সমর্থিত নয়। তাই সকল প্রকার কু-প্রথা মর্সিয়া-মাতম বর্জন করে শাহাদাতে কারবালার প্রকৃত শিক্ষা ও তাৎপর্য বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করার নিবেদন রইল। চিরদিন যেন আমাদের সকলের অন্তরে আহলে বাইতে রাসূলের প্রতি মহব্বত বিরাজমান থাকে মহান আল্লাহর দারবারে এ ফরিয়াদ করি, আল্লাহ সেই তাওফীক দান করুক । আমীন

আরও পড়ুন

রোজার ফাজায়েল এবং মাসায়েল
মুমিনের ছয় বৈশিষ্ট্য
২০৩০ সালে রমজান মাস হবে দুইটি
আমিরাতে রোজা শুরু মঙ্গলবার
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে রোজা শুরু মঙ্গলবার
দুর্দিনে আল্লাহর সাহায্য লাভের ৩ আমল
১৩ এপ্রিল রমজান ঘোষণা ফিলিস্তিনের
পবিত্র রাতের ফজিলত