ঢাকা
১৮ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

দেখে এলাম অপরূপা বাঁশবাড়িয়া

দীর্ঘ সময় ধরে একই পরিবেশে থাকলে একেঘেঁয়ে লাগে। তাই প্রয়োজন হাওয়া বদল অর্থাৎ কোথাও ঘুরে আসা। সেটা হতে পারে কোন লং ড্রাইভে যাওয়া, হতে পারে দর্শনীয় কোন প্রাকৃতিক পরিবেশ।
পারিবারিক, পেশাগত সহ বিভিন্ন ব্যস্ততায় কেমন যেন অসুস্থতা বোধ করছিলাম। কেউ কেউ এটা কে বলেন “হাঁপিয়ে” ওঠা। কিন্তু আমি বলব না। কারণ হাঁপিয়ে উঠলো মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চায়। আমি জানি, আমার একটা সুন্দর পরিবার আছে, আছে সম্মানজনক পেশা। এগুলো ছেড়ে দিতে পারব না। কাজের চাপে পড়ে মনে হচ্ছিল, এসব ভুলে গিয়ে কোথায়ও কিছুটা সময়ের জন্য ঘুরে এলে আমার অসুস্থ ভাবটা কেটে যাবে। প্রেসার ডায়াবেটিস সহ সদ্য করোনা মুক্তির পর শরীরে বিশেষ প্রাণশক্তি নিতে চাচ্ছিলাম। এমন সময় জানতে পারলাম ফেনীতে “ঠিকানা ট্রাভেলার্স”একটা পিকনিকের আয়োজন করেছে। বাঁশবাড়িয়া সী বিচ গিয়ে ফেরার পথে আরশিনগর ফিউচার পার্কে ঘুরে আসবে।
প্রথমে কেউ আমাকে আমন্ত্রণ জানায়নি। হতে পারে covid-19 থেকে সদ্যই বেঁচে ফেরা মানুষ হওয়াতে এমনটাই ঘটেছে। আবার আমিও সে চায় তাদেরকে আমার ইচ্ছার কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছিলাম। এর কারণ দুটো। সবাই ভাববে, আমি এত তাড়াতাড়ি সুস্থ হলাম কিভাবে? অর্থাৎ ‘নজর’ লাগবে। দ্বিতীয় কারণ, মনে হল covid-19 কারণে হয়তো আয়োজকদের পরিবার নিয়ে সীমিত পরিসরে যাচ্ছে।আমার ইচ্ছের কথা জানালে আমাকে নিতে না পারার কারণে ওরা লজ্জা পাবে।
মজার ব্যাপার হল বিষয়টা উল্টো ছিল। পরে জেনেছি, ওরা ভেবেছে আমি অসুস্থ মানুষ, কোভিড থেকে সেরে উঠলেও হয়তো শারীরিক দুর্বলতা কাটেনি। লং জার্নি করতে পারবো না। যাই হোক পানকৌড়ির কর্ণধার কবি হেলাল শাহাদাতকে একটু হালকা কাঁচুমাচু করে জানতে চাইলাম-কিরে ভাই, বোনকে রেখে চলে যাচ্ছেন?
মনে হলো উনি এ ধরনের একটা কিছু শোনার অপেক্ষায় ছিলেন। বললেন, রেখে যাচ্ছি কে বলল?
আমিতো আপনার সাথে যাচ্ছি।
ব্যস…।
জানুয়ারির ১৫ তারিখ, শুক্রবার। আমরা ৪০ জন বাঁশবারিয়ার উদ্দেশ্যে বাসযোগে রওনা হই। চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে হাইরোড থেকে ডানদিকে পাড়ার রাস্তা ধরে এক কিলোমিটার ভিতরে গেলেই “বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত”। জায়গাটা মূলত সীতাকুন্ড থানায়। নির্ধারিত পৌঁছার পর অদূরে সমুদ্রকে দেখতে পেলাম। সৈকত নামের যেই বালুকাবেলা দেখার কথা সেটা প্রথমে নজরে আসেনি। কিঞ্চিৎ সৈকত। তবে অনেক বিস্তৃত, সুন্দর। মাঝে মাঝে প্রবাল সদৃশ্য শক্ত কিছু দেখা যাচ্ছিল। আমরা পৌঁছেছিলাম বেলা পৌনে বারোটার দিকে। সামনের দিকে একটু দূরে সাগর, পিছনের ঝাউবন এবং প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উঠা কিছু তীরবর্তী গাছপালা দেখলেও লোনাপানিতে পারছিলাম না। তবুও বিস্তীর্ণ সৈকতে সবাইকে প্রায় সমান উৎপন্ন করে রেখেছিল। পর্দা ও আদাপর্দা মানুষগুলো মেতেছিলাম ছবি তোলার উৎসবে।

আমাদের সাথে ছিল মম, মুত্তাকী, বর্ণ, রাফিয়া ও অহনা সহ কিছু শিশু। ওরা বাবল ফোলানো, ছোটাছুটি করা আর দুষ্টমিতে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
বেলা দেড়টার দিকে সবাই ঝাউবনে খেতে বসি। তবে একসাথে নয়। যার যেভাবে খুশি। প্রকৃতিকে উপভোগ করতে করতে আনন্দ-উল্লাসে থেকে খুব সাধারণ খাবারকেও কেউ অসাধারণ লাগছিল।
হঠাৎ দেখতে পেলাম সৈকতের একদম কিনার ঘেঁষে যে ইঞ্জিন চালিত নৌকাটা ঝিম মেরে পড়েছিল সেটাও চলতে শুরু করেছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, বিচে সাগরের ঢেউ গুলো একটু একটু করে আছড়ে পড়তে পড়তে আমাদের দিকে এগুচ্ছে অর্থাৎ জোয়ার আসছে। সেই এক অপরূপ দৃশ্য! এবার আর একে বাঁশবাড়িয়া নয়, মনে হচ্ছিল পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ‘কক্সবাজার’ সবার মাঝে ছবি তোলার উচ্ছ্বাস আরো বেড়ে গেল। আমি নিজে মোবাইলে পূর্বে ধারণ করা কিছু ছবি, ভিডিও ডিলিট করে মেমোরি খালি করলাম। তারপর আবার শুরু করলাম ছবি তোলা। ফজলু ভাই, কামরুল ভাই, জাহাঙ্গীর ভাই, আরিফ ভাই; কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের মন নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে লাগলেন । আমরা এখানে আসার পর একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার ছবি তুলছিলেন। আমিও উনার হাতে ছবি তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সময়ে কুলায়নি। দামি ক্যামেরায় , শক্তিশালী লেন্সে সাগরের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ইচ্ছা অপূর্ন রেখেই আমাদের ছুটতে হলো আরশিনগর ফিউচার পার্কের উদ্দেশ্যে। হাতে সময় ছিল কম, এদিকে ভীষণ নান্দনিক প্রকৃতিকে দেখার ইচ্ছে ছিল অনেক বেশি।
২৫-৩০ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম সেখানে, মানে আরশিনগর ফিউচার পার্কে। ১০০ টাকা প্রবেশ মূল্যে সেখানে ঘোরাঘুরি হলো। কোভিডের ধাক্কা পুরোপুরি যায়নি বলে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই আমার পক্ষে তেমন ঘোরাঘুরি সম্ভব হয়নি। তবে বাচ্চারা খুব মজা পেয়েছে। এরপর দ্রুততার সাথে কিছু মজাদার খেলা, ফটোসেশন ও পুরস্কার বিতরণ করা হলো। মহিলাদের বালিশ নিক্ষেপে ফিরোজী ভাইকে মনে হল, ইচ্ছে করে আমাকে জিতিয়ে দিলেন। মানে থার্ড করলেন। সন্ধ্যায় সাতটার মধ্যে আমরা ফেনীতে ফিরি।
বলে রাখা ভালো যে, আরশিনগর ফিউচার পার্কে প্রবেশ মূল্যে ১০০ টাকা যেটা বহন করেছে ঠিকানা ট্রাভেলার্স।
সেই ১০০ টাকা যাতায়াত, দুপুরের খাবার এবং সকাল-বিকাল হালকা নাস্তাসহ আমাদের প্রতি জনকে দিতে হয়েছে মাত্র পাঁচশত টাকা। এতে বোঝা যাচ্ছে, এটা একটা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। যেটা ভ্রমণপিপাসুদের পিপাসা মিটাবে।
তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে অনুরোধ করছি।
তবে উন্নত সাউন্ড সিস্টেম, উন্নত খাবার দাবার কিংবা অন্য কোন সেবা প্রদান করলে লাভ না করে পিকনিকের এন্টি ফি একটু বাড়ালে ও মনে হয় কেউ অমত করবে না। এতে ভ্রমণ উপভোগ হবে এবং পিপাসুদের মনোযোগ কাডবে।
আরেকটা ব্যাপার খুব জরুরী তা হলো, সবার আগে ভাবতে হবে নিরাপত্তার কথা। যেকোনো পিকনিকের আয়োজকরা যদি বিশৃংখলা বা অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা দিতে এবং নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারেন তাহলে অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা থাকে। (আল্লাহ না করুক) সেদিন কোন সমস্যা বা বিপদাপদ হয়নি। আমরা নিরাপদে বাড়ি ফিরি। সেজন্য মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই।

যাইহোক, উপরোক্ত বিষয়গুলো মাথায় রেখে এ ধরনের কিছু আয়োজন করলেন বলা যায়, ভ্রমণপিপাসুদের আরো বেশি আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে ঠিকানা ট্রাভেলার্স তথা আয়োজক কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষে আরেকটা কথা বলব, তা হল সব দায়িত্ব আয়োজকদের নয়। অংশগ্রহণকারীদের কিছু দায়িত্ব আছে। আয়োজকদের দিক নির্দেশনাগুলো তাদের মেনে চলতে হবে ।মনে রাখতে হবে নির্দেশনাগুলো মেনে না চললে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় সেটা বেশিরভাগ সময় অংশগ্রহণকারীদের জন্যই। তাই আসুন শৃঙ্খলা মেনে চলি, আমরা যেন অন্যের ক্ষতির কারণ না হই। ঠিকানা ট্রাভেলস এর জন্য রইল প্রাণঢালা শুভেচ্ছা।
লেখক: ফেরদৌস আরা শাহীন
প্রধান শিক্ষক: দমদমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কথা সাহিত্যিক

আরও পড়ুন

অনৈসর্গিক সৌন্দর্যের সেতুর দেশ পর্তুগাল
বন্ধ রাঙামাটি পর্যটন কেন্দ্রগুলো
কুয়াকাটায় পর্যটকের ঢল
বাঁশবাড়িয়া ও আরশি নগর ভ্রমণ
ঘুরে আসুন সেন্টমার্টিন
কুয়াকাটায় পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়
ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার উপায়
ঠিকানা ট্রাভেলার্সের আয়োজনে নৌভ্রমণ